“বাজারে যে চার আনা সম্মান পড়ে আছে, সেটাও একদিন হারিয়ে যাবে”
আমি তাঁর নাম উল্লেখ করা সমীচীন মনে করছি না। তিনি আমার কলেজজীবনের বন্ধু। পরবর্তীকালে আইনজীবী হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করার পর তাঁকে সহকর্মী হিসেবে পাশে পেয়েছি—এটিকে একসময় আমি আমার সৌভাগ্য বলেই মনে করতাম। তাঁর মতো প্রতিভা ও বাক্দক্ষতা আমার নেই—এ কথা স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই। তিনি প্রায় পনেরো বছর পাবলিক প্রসিকিউটর হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। রাজনৈতিক পালাবদলের পর তিনি নিজেকে আরএসএসের অনুগামী হিসেবে তুলে ধরেছেন; তবে এখন আর তিনি পিপি পদে নেই। সেই কারণে তাঁর মনে দুঃখ বা অভিমান থাকা অস্বাভাবিক নয়।
২০১৩ সালে আমি প্রথমবার আমার সেরেস্তায় খুব ছোট পরিসরে শ্রীশ্রী গণপতি পূজার সূচনা করি। কোনো প্রচার, প্রদর্শন বা ব্যক্তিগত স্বার্থের উদ্দেশ্যে নয়—নিছক ভক্তি, বিশ্বাস এবং সহকর্মীদের নিয়ে আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার আন্তরিক ইচ্ছা থেকেই সেই আয়োজন। পরবর্তী বছরেও পূজা করি এবং ধারাবাহিকভাবে তা চালিয়ে যেতে থাকি।
২০১৪ সালে আমার সেই কলেজবন্ধু গণপতি পূজায় যোগদান করেন এবং সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন। তাঁর উপস্থিতি ও অংশগ্রহণ দেখে আমি অত্যন্ত আপ্লুত হয়েছিলাম। একজন পুরোনো বন্ধু আমার উদ্যোগকে আপন করে নিয়েছেন—এই অনুভূতি আমাকে সত্যিই আনন্দ দিয়েছিল। সেই সহযোগিতার জন্য আমি আজও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ।
কিন্তু তাঁর অংশগ্রহণের পর থেকেই প্রতি বছর আমাকে এক অদ্ভুত মানসিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হতো। প্রায়ই তাঁর কাছ থেকে শুনতাম—“অমুক তোমার সম্পর্কে এই কথা বলেছে”, “তমুক তোমাকে পছন্দ করে না”, “সে তোমার নামে ওই কথা বলেছে”, “ও ভালো মানুষ নয়”, “ও তোমার ক্ষতি করতে চায়”—ইত্যাদি।
আশ্চর্যের বিষয়, যাঁদের নামে এসব কথা বলা হতো, তাঁদের কেউ কখনো সরাসরি এসে আমাকে তেমন কিছু বলেননি। সব কথার একমাত্র বাহক ছিলেন তিনিই। ধীরে ধীরে আমার মনে প্রশ্ন জাগতে শুরু করল—সত্যিই কি এত মানুষ আমার বিরুদ্ধে কথা বলছেন, নাকি পরিকল্পিতভাবে আমার মনে অন্যদের সম্পর্কে সন্দেহ, বিরক্তি ও দূরত্ব সৃষ্টি করা হচ্ছে?
প্রতি বছর পূজার আনন্দের পরিবর্তে আমাকে নানা অভিযোগ, কানকথা এবং মানসিক চাপ বহন করতে হতো। পূজার মতো একটি পবিত্র ও আনন্দময় আয়োজন ক্রমশ আমার কাছে মানসিক যন্ত্রণার কারণ হয়ে উঠল। সেই চাপ আর সহ্য করতে না পেরে ২০১৭ সালে শেষবার গণপতি পূজা করি এবং ২০১৮ সাল থেকে আদালত প্রাঙ্গণে আমার উদ্যোগে পূজা বন্ধ করে দিই।
এরপর ঘটল আরও একটি তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা।
২০১৮ সালে সেই পরম বন্ধু—যাঁর নাম এখনো আমি প্রকাশ করতে চাই না—তিনজনকে নিয়ে একটি দল তৈরি করে আদালত প্রাঙ্গণে গণপতি পূজার আয়োজন শুরু করলেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, যেহেতু আমি আর পূজা করছি না, তাই তিনি নাকি আমার শুরু করা পূজাটিই চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন।
কথাটি শুনতে নিঃসন্দেহে আবেগপূর্ণ। কিন্তু আমার উপলব্ধি ছিল ভিন্ন। যাঁরা একসময় আমার সঙ্গে ছিলেন, তাঁদের ধীরে ধীরে নিজের দিকে নিয়ে গিয়ে তিনি নতুন গোষ্ঠী তৈরি করলেন। পূজার আয়োজন চলল; কিন্তু ভক্তির সঙ্গে সঙ্গে ব্যক্তিগত প্রচারের মাত্রাও যেন বাড়তে থাকল।
আমার পর্যবেক্ষণে, তিনি পূজার অধিকাংশ দায়িত্ব অন্যদের মধ্যে ভাগ করে দিতেন। কেউ অর্থ সংগ্রহ করতেন, কেউ আয়োজন করতেন, কেউ দৌড়ঝাঁপ করতেন, কেউ ব্যয়ভার বহন করতেন—আর তিনি পরিচিত মহলে নিজেকে পূজার প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে তুলে ধরতেন। বিচারক, প্রবীণ আইনজীবী ও অন্যান্য বিশিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে গিয়ে জানাতেন যে তিনিই পূজাটি করছেন; তাঁদের সঙ্গে ছবি তুলতেন, লাড্ডু বা প্রসাদের প্যাকেট দিতেন এবং নিজের উদ্যোগের ব্যাপক প্রচার করতেন।
এই ধরনের আচরণের ক্ষেত্রে বাংলার একটি পুরোনো প্রবাদ অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—
“পরের পয়সায় পোদ্দারি।”
অর্থাৎ, আয়োজন করবে অন্যরা, পরিশ্রম করবে অন্যরা, ব্যয় বহন করবে অন্যরা—কিন্তু কৃতিত্বের আলোটি থাকবে একজনের মুখের ওপর। ধর্মীয় অনুষ্ঠান যদি ব্যক্তিগত পরিচিতি বৃদ্ধি, প্রভাব বিস্তার কিংবা ভবিষ্যৎ সুবিধা অর্জনের মাধ্যম হয়ে ওঠে, তবে সেখানে ভক্তির চেয়ে আত্মপ্রচারের আয়োজনই বড় হয়ে দাঁড়ায়।
আরও একটি বিষয় আমি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করেছি—প্রায় প্রতি বছরই তাঁর বন্ধু, সহযোগী ও ঘনিষ্ঠ মহল বদলে যায়। যাঁরা একসময় তাঁর অত্যন্ত কাছের মানুষ ছিলেন, কিছুদিন পর তাঁদের সঙ্গেই সম্পর্কের অবনতি ঘটে। নতুন মানুষ আসেন, নতুন দল তৈরি হয়, কিছুদিন তাঁদের নিয়ে চলা হয়; তারপর আবার ভুল বোঝাবুঝি, বিরোধ এবং বিচ্ছেদ।
গত বছরও তাঁর পূজার প্রধান সহযোগী হিসেবে যে কয়েকজনকে দেখা গিয়েছিল, পরে তাঁদের মধ্যকার ঐক্য ভেঙে যায়। বন্ধুত্ব শেষ হয়ে যায়; দলও আর আগের মতো থাকে না। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠেছিল—এ বছরের পূজার দায়িত্ব কে নেবে? এবার তিনি কার সহযোগিতার ওপর ভর করে নিজেকে প্রধান উদ্যোক্তা হিসেবে তুলে ধরবেন? কার কাঁধে বসে তিনি ঘুরবেন এবং বলবেন—“দেখুন, আমি গণপতি পূজা করছি”?
একসময় তিনি একজন বন্ধুকে সঙ্গে নিয়ে আমার কাছেও এসেছিলেন। সম্ভবত তিনি চেয়েছিলেন, আমি আবার তাঁর আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত হই। কিন্তু পূর্বের অভিজ্ঞতার কারণে আমি সেই প্রস্তাবে সম্মত হইনি। বরং বন্ধুর অধিকার থেকেই তাঁকে সতর্ক করে বলেছিলাম—
“এইভাবে চলতে থাকলে বাজারে আপনার যে চার আনা সম্মান পড়ে আছে, সেটাও একদিন হারিয়ে যাবে।”
আমার কথাটি হয়তো তাঁর ভালো লাগেনি। এরপর তিনি আমার মোবাইল নম্বর ব্লক করে দিলেন, হোয়াটসঅ্যাপেও আমাকে ব্লক করলেন এবং আমাদের কলেজের গ্রুপ থেকেও বেরিয়ে গেলেন। তারপর সেই বন্ধুকে সঙ্গে নিয়েই তিনি গণপতি পূজার আয়োজন করেছেন এবং করছেন।
আমাকে ভুল বোঝার কোনো কারণ নেই। পূজা বা গণপতি পূজার প্রতি আমার কোনো আপত্তি কোনোদিন ছিল না, আজও নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকবে না। আমি নিজেই ভক্তি ও ভালোবাসা নিয়ে এই পূজার সূচনা করেছিলাম। আমার আপত্তি পূজার বিরুদ্ধে নয়; আপত্তি তখনই, যখন পূজাকে আত্মপ্রচার, ব্যক্তিগত প্রভাব বিস্তার এবং সুবিধা অর্জনের সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করা হয়।
ভগবানকে সামনে রেখে যদি কেউ নিজের ছবি, নিজের পরিচয় এবং নিজের প্রভাবের প্রচারকেই প্রধান উদ্দেশ্য করে তোলে, তবে সেটি আধ্যাত্মিকতা নয়—সেটি আত্মপ্রচারের অভিনব কৌশল। ভক্তি নীরব হতে পারে, কিন্তু আত্মপ্রচার সর্বদা শব্দ করে। প্রকৃত সেবা মানুষকে বিনয়ী করে; আর স্বার্থনির্ভর আয়োজন মানুষকে কৃতিত্বের হিসাব করতে শেখায়।
আমার অভিজ্ঞতায়, তাঁর কাছে মানুষ ততক্ষণই ভালো, যতক্ষণ সেই মানুষটি তাঁর কাজে লাগছে, তাঁর পরিকল্পনাকে সমর্থন করছে অথবা তাঁর পরিচিতি ও স্বার্থ বৃদ্ধিতে সাহায্য করছে। কেউ স্বাধীন মত প্রকাশ করলে কিংবা তাঁর উদ্দেশ্য পূরণে সহায়ক না হলে, সেই মানুষটিই হঠাৎ খারাপ হয়ে যায়। তখন তার বিরুদ্ধে অভিযোগ, কানকথা ও নিন্দার নতুন অধ্যায় শুরু হয়।
সম্পর্ক কোনো ব্যবহারযোগ্য উপকরণ নয়। বন্ধুত্বের মূল্য তখনই থাকে, যখন সেখানে বিশ্বাস, পারস্পরিক সম্মান এবং নিঃস্বার্থতা থাকে। প্রয়োজনমতো মানুষকে কাছে টেনে নেওয়া এবং কাজ শেষ হলে দূরে সরিয়ে দেওয়াকে বন্ধুত্ব বলা যায় না। এটি কেবল স্বার্থের সাময়িক সমীকরণ।
এত স্বার্থকেন্দ্রিকভাবে সম্পর্ক পরিচালনা করতে আমি খুব কম মানুষকেই দেখেছি। যত ভাবি, ততই বিস্মিত হই—একজন প্রতিভাবান মানুষ সামান্য প্রচার, প্রভাব ও সুবিধার জন্য কেন বারবার নিজের সম্পর্ক, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং সামাজিক সম্মানকে বিপন্ন করবেন?
তবুও আমি তাঁর অমঙ্গল চাই না। ব্যক্তিগত কষ্ট ও তিক্ত অভিজ্ঞতার পরেও আমার প্রার্থনা—ভগবান তাঁকে শুভবুদ্ধি দিন, প্রকৃত বন্ধু চিনতে শেখান এবং পূজাকে ব্যক্তিগত প্রচারের মাধ্যম নয়, আত্মশুদ্ধি ও মানবিক মিলনের উৎসব হিসেবে উপলব্ধি করার শক্তি দিন।
জয় গণপতি। জয় সিদ্ধিদাতা।
এখন শুধু সময়ের অপেক্ষা। দেখা যাক, বাজারে যে “চার আনা” সম্মান এখনো অবশিষ্ট আছে, সেটি তিনি কত দিন ধরে রাখতে পারেন। কারণ সম্মান প্রচার করে অর্জন করা যায় না; সম্মান অর্জন করতে হয় আচরণ, সততা, বিনয় এবং মানুষের প্রতি নিঃস্বার্থ ব্যবহারের মাধ্যমে।
মানুষকে ব্যবহার করে সাময়িক সুবিধা পাওয়া সম্ভব, কিন্তু চিরদিন মানুষের বিশ্বাস ধরে রাখা সম্ভব নয়। মুখোশ যত সুন্দরই হোক, সময় একদিন তার আড়ালের মুখটি প্রকাশ করেই দেয়।
ভগবান তাঁর মঙ্গল করুন।