শুভ পশ্চিমবঙ্গ দিবস
২০ জুন, ২০২৬
পশ্চিমবঙ্গ দিবস কেবলমাত্র একটি আনুষ্ঠানিক দিবস নয়; এটি বাঙালির ইতিহাস, ঐতিহ্য, সংস্কৃতি, আত্মপরিচয় এবং আত্মমর্যাদার এক গৌরবময় স্মারক। প্রতি বছর ২০শে জুন পশ্চিমবঙ্গ দিবস পালিত হয় সেই ঐতিহাসিক ঘটনার স্মরণে, যখন ১৯৪৭ সালের ২০শে জুন বঙ্গীয় আইনসভা (Bengal Legislative Assembly) ভারত বিভাগের প্রাক্কালে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে যে হিন্দু-অধ্যুষিত পশ্চিমাঞ্চল ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে একটি পৃথক প্রদেশ হিসেবে গঠিত হবে। সেই ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তের ফলস্বরূপ স্বাধীনতার পরে ‘পশ্চিমবঙ্গ’ রাজ্যের জন্ম হয়।
এই দিবস আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে পশ্চিমবঙ্গের ইতিহাস শুধুমাত্র ভৌগোলিক সীমারেখার ইতিহাস নয়; এটি একটি সভ্যতার ইতিহাস। প্রাচীন গৌড়, বঙ্গ, রাঢ় ও বরেন্দ্রভূমির ঐতিহ্য বহন করে আজকের পশ্চিমবঙ্গ ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক, সাহিত্যিক, শিক্ষাগত ও রাজনৈতিক বিকাশে এক অসামান্য অবদান রেখে চলেছে।
পশ্চিমবঙ্গের ভূমি জন্ম দিয়েছে অসংখ্য মনীষীকে, যাঁদের চিন্তা, আদর্শ ও কর্ম ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের ইতিহাসে চিরস্মরণীয়। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মানবতাবাদের বাণী বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে দিয়েছেন; নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু স্বাধীনতা সংগ্রামে আত্মবলিদান ও জাতীয়তাবাদের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন; স্বামী বিবেকানন্দ ভারতীয় দর্শন ও আধ্যাত্মিকতাকে বিশ্বমঞ্চে প্রতিষ্ঠিত করেছেন; বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘বন্দে মাতরম্’ ভারতীয় জাতীয় চেতনার অন্যতম ভিত্তি হয়ে উঠেছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবসের আলোচনায় ড. শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের অবদান বিশেষভাবে স্মরণীয়। ১৯৪৭ সালে বঙ্গভঙ্গের সংকটময় সময়ে তিনি পশ্চিমবঙ্গকে ভারতের অংশ হিসেবে রক্ষার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব প্রদান করেন। তাঁর দৃঢ় রাজনৈতিক অবস্থান এবং সাংগঠনিক প্রচেষ্টার ফলে বাংলার একটি বৃহৎ অংশ ভারতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে পশ্চিমবঙ্গ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করতে সক্ষম হয়। তাই পশ্চিমবঙ্গ দিবসের ঐতিহাসিক তাৎপর্যের সঙ্গে ড. মুখোপাধ্যায়ের নাম অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত।
আজকের পশ্চিমবঙ্গ শিক্ষা, সাহিত্য, শিল্প, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, কৃষি, শিল্পোন্নয়ন ও সামাজিক সংস্কারের ক্ষেত্রে দেশের অন্যতম অগ্রণী রাজ্য। কলকাতা, যা একসময় ব্রিটিশ ভারতের রাজধানী ছিল, এখনও ভারতের অন্যতম প্রধান সাংস্কৃতিক ও বৌদ্ধিক কেন্দ্র। বাংলা ভাষা, বাংলা সাহিত্য, বাংলা নাটক, বাংলা সিনেমা এবং বাংলার লোকসংস্কৃতি ভারতের বহুত্ববাদী ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে।
পশ্চিমবঙ্গ দিবস আমাদের কাছে আত্মসমালোচনা ও আত্মপ্রত্যয়েরও দিন। অতীতের গৌরব স্মরণ করার পাশাপাশি বর্তমানের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে একটি উন্নত, সমৃদ্ধ, শিক্ষিত, নিরাপদ এবং ঐক্যবদ্ধ পশ্চিমবঙ্গ গড়ে তোলার অঙ্গীকার গ্রহণ করার দিন এটি। সামাজিক সম্প্রীতি, জাতীয় ঐক্য, সাংস্কৃতিক গৌরব এবং উন্নয়নের পথে অগ্রসর হওয়ার প্রেরণা আমরা এই দিবস থেকে লাভ করি।
আসুন, এই পশ্চিমবঙ্গ দিবসে আমরা সকলেই বাংলার সমৃদ্ধ ইতিহাস, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করি এবং আগামী প্রজন্মের জন্য একটি উন্নত ও গর্বিত পশ্চিমবঙ্গ নির্মাণে নিজেদের দায়িত্ব পালন করার সংকল্প গ্রহণ করি।
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফল—
পুণ্য হউক, পুণ্য হউক, পুণ্য হউক হে ভগবান।
শুভ পশ্চিমবঙ্গ দিবস।
জয় বাংলা, জয় হিন্দ।
No comments:
Post a Comment