Saturday, October 17, 2026

নতুন ভারত: দয়া নয়, মর্যাদার সঙ্গে সহযোগিতা

 

নতুন ভারত: দয়া নয়, মর্যাদার সঙ্গে সহযোগিতা

সহযোগিতা মানে দয়া দেখানো নয়। সহযোগিতা মানে পারস্পরিক সম্মান, পারস্পরিক স্বার্থ, পারস্পরিক লাভ এবং সমমর্যাদার ভিত্তিতে একে অপরের পাশে দাঁড়ানো।

বিশ্বকে বুঝতে হবে, আজকের নতুন ভারত অন্য কোনও দেশের দয়া, করুণা কিংবা রাজনৈতিক অনুগ্রহের উপর নির্ভর করে নিজের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে চায় না। ভারত বিশ্বাস করে গঠনমূলক আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব, প্রযুক্তিগত উন্নয়ন, কৌশলগত সহযোগিতা এবং শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানে। কিন্তু এই সহযোগিতার ভিত্তি হতে হবে সমতা, মর্যাদা ও পারস্পরিক স্বার্থ—চাপ সৃষ্টি, ভয় দেখানো কিংবা আনুগত্য আদায়ের প্রত্যাশা নয়।

নতুন ভারত কারও কাছে অনুগ্রহ ভিক্ষা করে না; ভারত ন্যায্য সুযোগ প্রত্যাশা করে। ভারত বিশেষ কোনও সুযোগ-সুবিধার দাবি করে না; ভারত তার ন্যায্য স্বার্থের প্রতি সম্মান প্রত্যাশা করে।

প্রত্যেকটি দেশের নিজস্ব জাতীয় স্বার্থ রয়েছে। তেমনই ভারতেরও পূর্ণ অধিকার রয়েছে নিজের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক অগ্রগতি, নিরাপত্তা এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করার। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কখনও এমন কোনও ব্যবস্থায় পরিণত হতে পারে না, যেখানে একটি দেশ নিজেকে দাতা এবং অন্য দেশকে চিরস্থায়ী গ্রহীতা বলে মনে করবে।

নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হোক কিংবা পরবর্তীকালে সেই নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হোক—উভয়েরই অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক প্রভাব থাকতে পারে। ভারত সেই প্রভাব যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিচার করবে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞা আরোপ কিংবা তা প্রত্যাহার করাকে ভারতের জাতীয় নীতি নির্ধারণের উপর অন্য কোনও দেশের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার উপায় বলে মনে করা উচিত নয়।

ভারত একটি সার্বভৌম রাষ্ট্র। ভারতের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার ভারতেরই।

আন্তর্জাতিক কূটনীতি ধৈর্য, দূরদর্শিতা, বাস্তববোধ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার উপর প্রতিষ্ঠিত। কোনও সাময়িক চাপ, রাজনৈতিক বক্তব্য কিংবা কূটনৈতিক পদক্ষেপের ভিত্তিতে ভারতের জাতীয় স্বার্থ নির্ধারিত হবে না। প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ, প্রতিটি নীতিগত পরিবর্তন এবং প্রতিটি আন্তর্জাতিক অবস্থান আমাদের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বিবেচনার বিষয়। দেশের স্বার্থ, জনগণের কল্যাণ এবং ভবিষ্যৎ কৌশলগত প্রয়োজনের কথা মাথায় রেখেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে।

ভারত সংশোধনকে স্বাগত জানায়। ভুল বোঝাবুঝির অবসান হলে ভারত তাকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করে। কোনও পক্ষ তার অন্যায্য অবস্থান সংশোধন করলে, ন্যায্যতার পথে ফিরে এলে কিংবা পারস্পরিক লাভের ভিত্তিতে নতুন সম্পর্ক গড়ে তুলতে আগ্রহী হলে, ভারত সেই উদ্যোগকে সম্মান জানাতে প্রস্তুত।

সংশোধনকে স্বাগত জানানো দুর্বলতা নয়; বরং যুক্তি, পরিণতিবোধ ও কূটনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচয়।

কিন্তু সদিচ্ছাকে অসহায়তা বলে ভুল করা উচিত নয়। সহযোগিতার মানসিকতাকে আত্মসমর্পণের ইঙ্গিত হিসেবেও দেখা উচিত নয়। ভারত শান্তি চায়, কিন্তু সেই শান্তি হতে হবে মর্যাদাপূর্ণ। ভারত বন্ধুত্ব চায়, কিন্তু সেই বন্ধুত্ব হতে হবে পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে। ভারত অংশীদারিত্ব চায়, কিন্তু সেই অংশীদারিত্বে কোনও পক্ষের উপর অযৌক্তিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার সুযোগ থাকতে পারে না।

ভারতের দিকে রক্তচক্ষু দেখানোর চেষ্টা করবেন না। আলোচনার টেবিলে আসুন, যুক্তির ভাষায় কথা বলুন এবং পারস্পরিক সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়ে তুলুন।

হুমকি, ভয় প্রদর্শন কিংবা শক্তির আস্ফালন কখনও সুস্থ কূটনীতির বিকল্প হতে পারে না। দীর্ঘস্থায়ী আন্তর্জাতিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে বিশ্বাসযোগ্যতা, ন্যায্যতা, ধারাবাহিকতা এবং একে অপরের সার্বভৌম সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে।

ভারত বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন জীবন্ত সভ্যতার ধারক। যুগে যুগে ভারত সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন, বিশ্বশক্তির পরিবর্তন এবং আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার নানা রূপান্তর প্রত্যক্ষ করেছে। ভারতের সভ্যতাগত ঐতিহ্য জ্ঞান, কর্তব্য, সংযম, যুক্তি, সহিষ্ণুতা এবং নৈতিকতার গুরুত্বকে বারবার তুলে ধরেছে।

এই ঐতিহ্য ভারতকে সংঘাতের পথে অন্ধভাবে এগিয়ে যেতে শেখায় না। বরং তা শেখায় কখন আলোচনা করতে হয়, কখন ধৈর্য ধরতে হয়, কখন সংশোধনের সুযোগ দিতে হয় এবং কখন নিজের ন্যায্য অবস্থানে দৃঢ় থাকতে হয়।

প্রাচীন সভ্যতার প্রকৃত শক্তি শুধু তার ইতিহাসে নয়, তার শিক্ষা দেওয়ার ক্ষমতায়, সময়ের সঙ্গে নিজেকে বিকশিত করার ক্ষমতায় এবং প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও নিজের মর্যাদা অক্ষুণ্ণ রাখার ক্ষমতায়।

নতুন ভারত বিশ্বকে শত্রু হিসেবে দেখতে চায় না। ভারত সমস্ত দেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক, বাণিজ্য, প্রযুক্তি, বিনিয়োগ এবং শান্তিপূর্ণ সহযোগিতার পথ উন্মুক্ত রাখতে চায়। কিন্তু বন্ধুত্বের অর্থ নিজের জাতীয় স্বার্থ বিসর্জন দেওয়া নয়। সহযোগিতার অর্থ অন্যের নির্দেশে চলা নয়। আর শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের অর্থ অন্যায় চাপের সামনে নতিস্বীকার করা নয়।

নতুন ভারত চায়—

  • অধীনতা নয়, মর্যাদাপূর্ণ সহযোগিতা।

  • শোষণ নয়, পারস্পরিক লাভের অংশীদারিত্ব।

  • ভয় প্রদর্শন নয়, যুক্তিনির্ভর আলোচনা।

  • একতরফা চাপ নয়, ন্যায্য কূটনৈতিক সমঝোতা।

  • পরনির্ভরতা নয়, আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা।

বিশ্বের প্রতিটি দেশের কাছে ভারতের বার্তা স্পষ্ট—ভারত সহযোগিতা করতে প্রস্তুত, আলোচনা করতে প্রস্তুত এবং ন্যায্য সংশোধনকে স্বাগত জানাতে প্রস্তুত। কিন্তু ভারতের জাতীয় স্বার্থ, সার্বভৌমত্ব এবং ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে ভারত নিজেই, তার নিজস্ব বিবেচনা ও সাংবিধানিক মূল্যবোধের ভিত্তিতে।

ভারতকে সম্মান করুন। ভারতের সঙ্গে সহযোগিতা করুন। ভারতের সঙ্গে অংশীদারিত্ব গড়ে তুলুন। কিন্তু শান্তির প্রতি ভারতের অঙ্গীকারকে কখনও তার দৃঢ়তার অভাব বলে ভুল করবেন না।

জয় হিন্দ! বন্দে মাতরম!

— অশোক কুমার সিং
অ্যাডভোকেট, হাইকোর্ট, কলকাতা

No comments:

Post a Comment