Saturday, October 17, 2026

বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার নতুন সংগ্রাম: সার্বভৌমত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার লড়াই

 

বিশ্বজুড়ে স্বাধীনতার নতুন সংগ্রাম: সার্বভৌমত্ব, প্রাকৃতিক সম্পদ ও জাতীয় পরিচয় রক্ষার লড়াই

আজ বিশ্বের বহু দেশ এক নতুন ধরনের ‘স্বাধীনতার সংগ্রাম’-এর মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।

এই সংগ্রাম সর্বদা বিদেশি শাসন থেকে মুক্ত হওয়ার প্রচলিত অর্থে সীমাবদ্ধ নয়। অনেক ক্ষেত্রেই এর মূল প্রশ্ন হল—একটি দেশ কি তার নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদ, অর্থনৈতিক সম্পদ, কৌশলগত পরিকাঠামো, সাংস্কৃতিক পরিচয়, রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান এবং ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নিতে পারছে?

আজকের বিশ্বে স্বাধীনতার প্রশ্নটি তাই আরও গভীর ও বহুমাত্রিক হয়ে উঠেছে।

প্রশ্নটি হল—একটি দেশের প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ কার হাতে থাকবে? সেই দেশের জনগণ ও নিজস্ব প্রতিষ্ঠানগুলির হাতে, নাকি এমন বহিরাগত শক্তির হাতে, যারা অর্থনীতি, সম্পদ, নীতি ও কৌশলগত সিদ্ধান্তের উপর প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম?

প্রতিটি সার্বভৌম রাষ্ট্রকে এই প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে দূরদর্শিতা, বাস্তববোধ এবং সতর্কতার সঙ্গে।

১. স্বাধীনতার সংগ্রামের পরিবর্তিত অর্থ

অতীতে স্বাধীনতার আন্দোলন সাধারণত ঔপনিবেশিক শাসন, বিদেশি দখলদারি কিংবা প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক আধিপত্যের অবসান ঘটানোর জন্য পরিচালিত হত। সেই সংগ্রামের চেহারা ছিল স্পষ্ট—বিদেশি শাসক, ঔপনিবেশিক প্রশাসন, আরোপিত আইন এবং রাজনৈতিক পরাধীনতা।

কিন্তু বর্তমান বিশ্বে প্রভাব বিস্তারের পদ্ধতি অনেক বেশি জটিল হতে পারে।

অর্থনৈতিক নির্ভরতা, অসহনীয় ঋণের বোঝা, গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোর উপর নিয়ন্ত্রণ, খনিজ ও জ্বালানি সম্পদের প্রতিযোগিতা, সরবরাহব্যবস্থার উপর নির্ভরতা, বহিরাগত রাজনৈতিক চাপ এবং তথ্যের অপব্যবহার—এসবই কোনও দেশের স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করতে পারে।

অবশ্যই, প্রত্যেক বিদেশি বিনিয়োগ, আন্তর্জাতিক চুক্তি, ঋণ কিংবা কূটনৈতিক অংশীদারিত্বকে শোষণ বলে মনে করা উচিত নয়। আন্তর্জাতিক সহযোগিতা একটি দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। কিন্তু যখন কোনও অসম সম্পর্ক একটি দেশের নিজস্ব নীতি নির্ধারণের স্বাধীনতাকে দুর্বল করে দেয়, অথবা দেশের জনগণকে তাদের নিজস্ব সম্পদের ন্যায্য সুফল থেকে বঞ্চিত করে, তখন সেই সম্পর্কের নিরপেক্ষ মূল্যায়ন অপরিহার্য হয়ে ওঠে।

আধুনিক স্বাধীনতার সংগ্রামের অন্তর্ভুক্ত হওয়া উচিত অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব, সম্পদের উপর জাতীয় অধিকার, প্রতিষ্ঠানগুলির স্বাধীনতা এবং কোনও ধরনের জবরদস্তি ছাড়াই নিজেদের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের অধিকার।

একটি দেশের জাতীয় পতাকা থাকতে পারে, নির্বাচিত সরকার থাকতে পারে, আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সীমান্তও থাকতে পারে—তবুও তার অর্থনৈতিক ও কৌশলগত স্বাধীনতা গুরুতর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে।

সেই কারণেই রাজনৈতিক স্বাধীনতার পাশাপাশি অর্থনৈতিক শক্তি, আত্মনির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দৃঢ়তা অপরিহার্য।

২. ভূখণ্ড দখলের বাইরে কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের বিপদ

শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলির নিজেদের স্বার্থ রক্ষার পদ্ধতি সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়েছে। প্রত্যক্ষ সামরিক আগ্রাসন আজও বাস্তব বিপদ। তবে বাণিজ্যিক বিধিনিষেধ, আর্থিক ব্যবস্থা, গুরুত্বপূর্ণ সরবরাহব্যবস্থা, প্রযুক্তিগত নির্ভরতা, কৌশলগত পরিকাঠামো এবং কূটনৈতিক চাপের মাধ্যমেও প্রভাব বিস্তার করা সম্ভব।

কখনও কখনও একাধিক দেশ নিজেদের অভিন্ন কৌশলগত স্বার্থে সমন্বিত নীতি গ্রহণ করতে পারে। এই ধরনের সহযোগিতা নিজে থেকেই অন্যায় বা অবৈধ নয়। কিন্তু যখন সম্মিলিত চাপের মাধ্যমে অন্য একটি দেশের সার্বভৌম সিদ্ধান্তকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয় কিংবা তার সম্পদ ও কৌশলগত ব্যবস্থার উপর অসামঞ্জস্যপূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করতে চাওয়া হয়, তখন বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

একটি রাষ্ট্রের দায়িত্ব হল, এই ঝুঁকিগুলি এমন পর্যায়ে পৌঁছানোর আগেই চিহ্নিত করা, যখন সেগুলি থেকে বেরিয়ে আসা কঠিন হয়ে পড়ে।

সবচেয়ে বড় বিপদ সব সময় ভূখণ্ড হারানো নয়। কখনও কখনও বিপদ হল—নিজের ভূখণ্ড, সম্পদ এবং অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ সম্পর্কে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা ক্রমশ হারিয়ে ফেলা।

প্রকৃত অংশীদারিত্ব ও অতিরিক্ত নির্ভরতার মধ্যে পার্থক্য বোঝা তাই প্রতিটি দেশের জন্য অত্যন্ত জরুরি।

৩. দক্ষিণ এশিয়ার শিক্ষা: শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ ও নেপাল

শ্রীলঙ্কা, বাংলাদেশ এবং নেপালের সাম্প্রতিক ও সমসাময়িক অভিজ্ঞতা বিভিন্নভাবে আমাদের সামনে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, জনবিশ্বাস এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্ব তুলে ধরেছে।

এই তিনটি দেশের ইতিহাস, রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং অর্থনৈতিক বাস্তবতা এক নয়। তাই তাদের অভিজ্ঞতাকে একই সূত্রে ব্যাখ্যা করা যুক্তিযুক্ত হবে না।

শ্রীলঙ্কার অর্থনৈতিক সংকট দেখিয়েছে, কীভাবে অভ্যন্তরীণ নীতিগত ব্যর্থতা, বৈদেশিক মুদ্রার ঘাটতি, ঋণের চাপ এবং বহিরাগত অর্থনৈতিক দুর্বলতা সম্মিলিতভাবে একটি দেশকে গভীর সংকটে ফেলতে পারে। সেই অভিজ্ঞতা আমাদের শেখায় যে বিচক্ষণ আর্থিক ব্যবস্থাপনা এবং টেকসই উন্নয়ন কতটা গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও পরিবর্তন প্রশাসন, রাজনৈতিক বৈধতা, জনঅংশগ্রহণ এবং প্রতিষ্ঠানগুলির সঙ্গে নাগরিকদের সম্পর্ক নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। দেশের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ভর করবে স্থিতিশীলতা, জবাবদিহি এবং জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য তার জনগণ ও প্রতিষ্ঠানগুলি কতটা কার্যকর ভূমিকা পালন করতে পারে তার উপর।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে নেপালকেও আঞ্চলিক শক্তিগুলির সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রেখে নিজের নীতিগত স্বাধীনতা রক্ষার চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়। তার জন্য প্রয়োজন ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি, অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতা এবং স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা।

এই অভিজ্ঞতাগুলি থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পাওয়া যায়—

জাতীয় সার্বভৌমত্ব শুধু আন্তর্জাতিক আলোচনার টেবিলে রক্ষা করা যায় না; তার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, সুশৃঙ্খল অর্থনীতি, জনসাধারণের আস্থা এবং জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা।

এই দেশগুলির প্রতিটি সংকট কিংবা রাজনৈতিক পরিবর্তন যে কোনও বহিরাগত শক্তির পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের ফল, এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর জন্য নির্দিষ্ট প্রমাণ প্রয়োজন। তবে যেখানে বহিরাগত হস্তক্ষেপের বাস্তব সম্ভাবনা রয়েছে, সেখানে তা উপেক্ষা না করে সতর্কতার সঙ্গে অনুসন্ধান করা উচিত।

৪. ইউরোপ ও আর্জেন্টিনা: জাতীয় স্বার্থ ও পরিচয় রক্ষার প্রশ্ন

ইউরোপের বিভিন্ন দেশে জাতীয় পরিচয়, অভিবাসন, জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা, অর্থনৈতিক নীতি এবং জাতীয় প্রতিষ্ঠানের ক্ষমতা নিয়ে বিতর্ক চলছে। প্রতিটি দেশ তার নিজস্ব ইতিহাস ও গণতান্ত্রিক বাস্তবতার ভিত্তিতে এই প্রশ্নগুলির উত্তর খুঁজছে।

আর্জেন্টিনাও মুদ্রাস্ফীতি, সরকারি ঋণ, অর্থনৈতিক স্বাধীনতা, প্রাকৃতিক সম্পদ, শিল্পোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিশ্রুতির সঙ্গে অভ্যন্তরীণ জাতীয় অগ্রাধিকারের সম্পর্ক নিয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে।

এই সমস্ত পরিস্থিতিকে একটি অভিন্ন আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র কিংবা একই ধরনের স্বাধীনতার সংগ্রাম বলে চিহ্নিত করা সঠিক হবে না। তবুও এগুলি একটি বৃহত্তর প্রশ্ন সামনে আনে—বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত থেকেও কীভাবে একটি দেশ নিজের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ রাখতে পারে?

প্রত্যেক দেশের অধিকার রয়েছে নিজের জাতীয় অগ্রাধিকার নিয়ে আলোচনা করার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রক্ষা করার, প্রাকৃতিক সম্পদের উপর ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করার এবং রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ব্যবহারকারীদের কাছে জবাবদিহি দাবি করার।

তবে জাতীয় পরিচয় রক্ষার নামে অন্য সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ ছড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। একটি আত্মবিশ্বাসী জাতি নিজের ঐতিহ্যকে রক্ষা করতে পারে, একই সঙ্গে অন্যদের সমান মর্যাদা ও অধিকারকেও সম্মান করতে পারে।

৫. ভারতের চ্যালেঞ্জ কেন স্বতন্ত্র

ভারতের পরিস্থিতি বিশেষভাবে জটিল, কারণ আমাদের ভূখণ্ড বিশাল, ভাষা ও সংস্কৃতি বৈচিত্র্যময়, জাতিগত পরিচয় বহুমাত্রিক এবং ধর্মীয় ঐতিহ্য অত্যন্ত সমৃদ্ধ।

আমাদের এই বৈচিত্র্য ভারতের অন্যতম বৃহত্তম শক্তি। কিন্তু এই শক্তিকে অক্ষুণ্ণ রাখতে প্রয়োজন প্রজ্ঞা, সাংবিধানিক শৃঙ্খলা, পারস্পরিক সম্মান এবং সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখার ধারাবাহিক প্রচেষ্টা।

ভারতের সার্বভৌমত্ব রক্ষার প্রশ্নটি শুধু অর্থনৈতিক কিংবা সামরিক ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে আমাদের প্রতিষ্ঠান, অর্থনীতি, সশস্ত্র বাহিনী, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, শিক্ষাব্যবস্থা এবং জনগণের সম্মিলিত শক্তি।

ভারতকে বহিরাগত চাপ, অর্থনৈতিক শোষণ, কৌশলগত ক্ষেত্রে অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার ঝুঁকি সম্পর্কে সতর্ক থাকতে হবে। একই সঙ্গে প্রমাণিত বিপদ এবং নিছক অনুমান, বৈধ সমালোচনা এবং বেআইনি হস্তক্ষেপের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য করতে হবে।

আমাদের সংবিধান, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং সামাজিক ঐক্যকে জাতীয় নিরাপত্তার কেন্দ্রে রাখতে হবে।

বৈচিত্র্যময় ভারত তার বৈচিত্র্যকে স্থায়ী বিভেদের কারণ হতে দিতে পারে না। আমাদের বৈচিত্র্যই হতে হবে সম্মিলিত জাতীয় শক্তির ভিত্তি।

কোনও বহিরাগত চাপ যেন আমাদের অভ্যন্তরীণ পার্থক্যকে জাতীয় দুর্বলতার উপকরণে পরিণত করতে না পারে। একই সঙ্গে জাতীয়তাবাদের নামে যেন বৈধ মতভেদকে দমন করা না হয় কিংবা নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার দুর্বল না করা হয়।

একটি ঐক্যবদ্ধ জাতি মানে এমন নয় যে প্রত্যেক নাগরিককে একইভাবে চিন্তা করতে হবে। বরং ঐক্যবদ্ধ জাতি হল সেই দেশ, যেখানে ভিন্ন বিশ্বাস, ভাষা ও পরিচয়ের মানুষ একই সাংবিধানিক কাঠামো এবং দেশের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ভবিষ্যতের প্রতি অঙ্গীকারবদ্ধ থাকেন।

৬. আগ্রাসী স্বার্থ ও শোষণের বিরুদ্ধে জাতীয়তাবাদ

গঠনমূলক ও সাংবিধানিক জাতীয়তাবাদ হল নিজের দেশের সার্বভৌমত্ব, সম্পদ, প্রতিষ্ঠান এবং সম্মিলিত ভবিষ্যৎ রক্ষা করার দৃঢ় সংকল্প।

এর অর্থ হল, প্রাকৃতিক সম্পদ এমনভাবে পরিচালিত হবে যাতে তার সুফল দেশের জনগণের কল্যাণে ব্যবহৃত হয়। কৌশলগত নির্ভরতা যেন কোনও দেশের উপর চাপ সৃষ্টি করার হাতিয়ারে পরিণত না হয়। দেশীয় শিল্প, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং গুরুত্বপূর্ণ পরিকাঠামোকে শক্তিশালী করা হবে। সরকারি সম্পদ, জনসাধারণের অর্থ এবং কৌশলগত স্বার্থসংশ্লিষ্ট চুক্তির ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা হবে।

প্রকৃত জাতীয়তাবাদ শুধু জাতীয় পতাকা প্রদর্শন কিংবা দেশপ্রেমের স্লোগান উচ্চারণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। প্রকৃত জাতীয়তাবাদ হল দক্ষ প্রশাসন, অর্থনৈতিক শক্তি, জনস্বার্থের সুরক্ষা, সামাজিক ঐক্য এবং জাতীয় সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দেশের স্বার্থ রক্ষা করা।

কোনও বহিরাগত শক্তি অন্যায্য সুবিধা নিতে চাইলে তার মোকাবিলা করতে হবে কৌশলগত প্রস্তুতির মাধ্যমে। কোনও চুক্তি ক্ষতিকর হলে তা আইনসম্মত পদ্ধতিতে পর্যালোচনা করতে হবে। দেশের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতা যদি তাকে বহিরাগত চাপের কাছে অসহায় করে তোলে, তাহলে সেই দুর্বলতাগুলিও দূর করতে হবে।

প্রতিটি অভ্যন্তরীণ সমস্যার জন্য বিদেশিদের দায়ী করলে ভারত শক্তিশালী হবে না। বরং বহিরাগত ঝুঁকি চিহ্নিত করার পাশাপাশি নিজেদের ভুল ও দুর্বলতা সংশোধন করলেই ভারত আরও শক্তিশালী হবে।

৭. ভারতকে কী করতে হবে?

ক্রমবর্ধমান আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার যুগে নিজেদের স্বাধীনতা রক্ষা করার জন্য ভারতকে কয়েকটি ক্ষেত্রে ধারাবাহিকভাবে এগিয়ে যেতে হবে।

  • প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা: খনিজ, জ্বালানি, জল, ভূমি এবং অন্যান্য কৌশলগত সম্পদের স্বচ্ছ, টেকসই ও জবাবদিহিমূলক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে।

  • অর্থনৈতিক সক্ষমতা বৃদ্ধি: দেশীয় শিল্প, গবেষণা ও উদ্ভাবনকে শক্তিশালী করতে হবে। সরবরাহব্যবস্থায় বৈচিত্র্য আনতে হবে এবং কোনও একটি বিদেশি অংশীদারের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে হবে।

  • কৌশলগত পরিকাঠামোর নিরাপত্তা: জ্বালানি, টেলিযোগাযোগ, পরিবহণ, আর্থিক ব্যবস্থা এবং ডিজিটাল নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ও স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে হবে।

  • ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতি: বিভিন্ন দেশের সঙ্গে গঠনমূলক সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে, কিন্তু কোনও বহিরাগত শক্তিকে ভারতের জাতীয় অগ্রাধিকার নির্ধারণ করতে দেওয়া যাবে না।

  • গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা: স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, আইনের শাসন এবং প্রশাসনের প্রতি জনবিশ্বাস বৃদ্ধি করতে হবে।

  • সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষা: ধর্মীয়, ভাষাগত, জাতিগত কিংবা আঞ্চলিক পার্থক্যকে বেআইনি উদ্দেশ্যে ব্যবহার করার প্রচেষ্টার বিরুদ্ধে সতর্ক থাকতে হবে।

  • ভবিষ্যৎ প্রজন্মে বিনিয়োগ: শিক্ষা, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, প্রতিরক্ষা সক্ষমতা এবং কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়াতে হবে, যাতে ভারতের স্বাধীনতা বাস্তব শক্তির উপর প্রতিষ্ঠিত হয়, কেবল বক্তব্যের উপর নয়।

এই পদক্ষেপগুলিই দীর্ঘস্থায়ী সার্বভৌমত্বের ভিত্তি গড়ে তুলবে।

৮. ভারতকে আত্মবিশ্বাসী, ঐক্যবদ্ধ ও প্রস্তুত থাকতে হবে

ভারতের সংগ্রাম কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক থেকে স্বতন্ত্র। আমাদের দেশের বিশালতা ও বৈচিত্র্য জাতীয় নিরাপত্তা সম্পর্কে একটি বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি দাবি করে।

আমাদের সীমান্ত রক্ষা করতে হবে, পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলিকেও রক্ষা করতে হবে। প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করতে হবে, পাশাপাশি তার সঠিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে। আমাদের সভ্যতাগত ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হবে, একই সঙ্গে জ্ঞান, উদ্ভাবন এবং আধুনিক অগ্রগতিকে গ্রহণ করতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল—একটি দেশ যখন অভ্যন্তরীণভাবে বিভক্ত, অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল কিংবা প্রাতিষ্ঠানিকভাবে ভঙ্গুর হয়ে পড়ে, তখন বহিরাগত চাপ মোকাবিলা করা আরও কঠিন হয়ে যায়।

ভারতের শক্তি নিহিত রয়েছে তার জনগণের সম্মিলিত ক্ষমতা, প্রতিষ্ঠানগুলির দক্ষতা, অর্থনীতির স্থিতিস্থাপকতা, সশস্ত্র বাহিনীর পেশাদারিত্ব এবং আমাদের বৈচিত্র্যময় সমাজকে একসূত্রে ধরে রাখা সাংবিধানিক মূল্যবোধের মধ্যে।

আমাদের প্রকৃত বিপদকে অবমূল্যায়ন করা চলবে না, আবার ভয়কে যুক্তির বিকল্পও হতে দেওয়া যাবে না। যেখানে সহযোগিতা দেশের মানুষের কল্যাণে সহায়ক, সেখানে সহযোগিতা করতে হবে। যেখানে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার জন্য দৃঢ় আলোচনা প্রয়োজন, সেখানে দৃঢ় থাকতে হবে। আর যেখানে অন্যায্য চাপ সৃষ্টি করা হবে, সেখানে আইনসম্মত, যুক্তিসংগত এবং কৌশলগতভাবে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমাদের লক্ষ্য অন্য কোনও দেশকে আধিপত্যের অধীনে আনা নয়। আমাদের লক্ষ্য হল—কোনও দেশ যেন ভারতকে আধিপত্যের অধীনে আনতে না পারে কিংবা ভারতীয় জনগণের ন্যায্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকারকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে।

শেষ কথা

আধুনিক বিশ্বের স্বাধীনতার সংগ্রাম বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রূপ নিতে পারে। কোথাও প্রধান সমস্যা অর্থনৈতিক অস্তিত্ব রক্ষা, কোথাও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা, কোথাও প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, কোথাও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন, আবার কোথাও জাতীয় পরিচয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ।

ভারতকে অন্য দেশগুলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে হবে, কিন্তু প্রত্যেক দেশ একই শত্রুর মুখোমুখি কিংবা একই ঐতিহাসিক পরিস্থিতির মধ্যে রয়েছে—এমন ধারণা করা উচিত নয়।

আমাদের পথ স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—দেশের অভ্যন্তরীণ শক্তি বৃদ্ধি, প্রাকৃতিক সম্পদের সুরক্ষা, সাংবিধানিক মূল্যবোধের প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ঐক্য রক্ষা এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতাকে ভারতীয় জনগণের ন্যায্য স্বার্থের অনুকূলে পরিচালিত করা।

আমাদের রয়েছে সমৃদ্ধ ইতিহাস, বিপুল মানবসম্পদ, বৈজ্ঞানিক সম্ভাবনা এবং প্রতিকূলতার মোকাবিলা করার ক্ষমতা।

ভারত দৃঢ় থাকবে। ভারত ঐক্যবদ্ধ থাকবে। ভারত তার সার্বভৌমত্ব রক্ষা করবে। প্রজ্ঞা, কঠোর পরিশ্রম, জাতীয় সংহতি এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে আমরা আমাদের সামনে থাকা চ্যালেঞ্জগুলির মোকাবিলা করব।

বন্দে মাতরম! জয় হিন্দ!

— অশোক কুমার সিং
অ্যাডভোকেট, হাইকোর্ট, কলকাতা

No comments:

Post a Comment