দপ্তরের উদ্যোগে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা হোক। এই কমিটিতে অভিজ্ঞ প্রাক্তন ফুটবলার, প্রশিক্ষক, ক্রীড়া প্রশাসক এবং প্রতিভা অন্বেষণের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে।
এই উদ্যোগে সুব্রত ভট্টাচার্য, মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য, সমরেশ চৌধুরী, শ্যাম থাপা, বাইচুং ভুটিয়ার মতো বিশিষ্ট প্রাক্তন ফুটবলারদের অভিজ্ঞতা ও পরামর্শ গ্রহণ করা যেতে পারে—তাঁরা উপলব্ধ থাকলে এবং অংশগ্রহণে সম্মত হলে। তাঁদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা, খেলার কৌশল সম্পর্কে জ্ঞান এবং ফুটবলার তৈরির বাস্তব অভিজ্ঞতা নতুন প্রজন্মের জন্য মূল্যবান সম্পদ হতে পারে।
এই কমিটির কাজ কেবল সুপারিশ পেশ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলে চলবে না। এর একটি সুস্পষ্ট কর্মপরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন।
প্রথমত—গ্রাম ও মফস্সল থেকে প্রতিভা অন্বেষণ।
পশ্চিমবঙ্গের প্রতিটি জেলা, মহকুমা, ব্লক এবং শহরাঞ্চলে নিয়মিত ফুটবল প্রতিভা অন্বেষণ শিবিরের আয়োজন করতে হবে। প্রত্যন্ত অঞ্চলের সেই সমস্ত ছেলেমেয়েকে সুযোগ দিতে হবে, যাঁদের মধ্যে অসাধারণ প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতা কিংবা যোগাযোগের অভাবে বড় ক্লাবের নজরে আসার সুযোগ হয় না।
দ্বিতীয়ত—বৈজ্ঞানিক ও পেশাদার প্রশিক্ষণ।
নির্বাচিত তরুণদের জন্য আধুনিক প্রশিক্ষণ, দক্ষ কোচ, ফিটনেস পরীক্ষা, পুষ্টি, ক্রীড়া-মনস্তত্ত্ব এবং নিয়মিত প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করতে হবে। শুধু প্রতিভা থাকলেই একজন খেলোয়াড় সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেন না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিচর্যা, শৃঙ্খলা এবং উপযুক্ত প্রশিক্ষণ।
তৃতীয়ত—সরকারি বৃত্তি ও আর্থিক সহায়তা।
দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবারের প্রতিভাবান ফুটবলারদের জন্য সরকারি ক্রীড়া-বৃত্তি চালু করা উচিত। প্রশিক্ষণ, যাতায়াত, ক্রীড়া-সরঞ্জাম, পুষ্টি, আবাসন এবং শিক্ষার ব্যয় বহনে সহায়তা দেওয়া হলে বহু তরুণ অর্থের অভাবে ফুটবল ছেড়ে দিতে বাধ্য হবেন না।
চতুর্থত—স্কুল, কলেজ ও স্থানীয় ক্লাবের সঙ্গে সমন্বয়।
বিদ্যালয় ও কলেজের ফুটবল প্রতিযোগিতাকে আরও শক্তিশালী করতে হবে। স্থানীয় ক্লাব, জেলা ক্রীড়া সংস্থা, প্রশিক্ষণকেন্দ্র এবং বড় ফুটবল ক্লাবগুলির মধ্যে একটি কার্যকর প্রতিভা-উন্নয়ন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে, যাতে একজন সম্ভাবনাময় খেলোয়াড়ের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা যায়।
পঞ্চমত—বড় ক্লাবগুলিতে সুযোগের বাস্তব মূল্যায়ন।
মোহনবাগান, ইস্টবেঙ্গল এবং অন্যান্য পেশাদার ক্লাবে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক দলে স্থানীয় ফুটবলারদের অংশগ্রহণ, প্রশিক্ষণের সুযোগ এবং মূল দলে উন্নীত হওয়ার হার সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা উচিত। তথ্যের ভিত্তিতে বোঝা যাবে, সমস্যাটি প্রতিভা অন্বেষণে, প্রশিক্ষণে, নির্বাচনে, নাকি পেশাদার ফুটবলের বৃহত্তর কাঠামোতে।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট থাকা জরুরি: কোনও খেলোয়াড়কে কেবল তাঁর ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দলে নেওয়া উচিত নয়। দলে জায়গা পাওয়ার প্রধান ভিত্তি হবে যোগ্যতা, দক্ষতা, পরিশ্রম এবং পারফরম্যান্স। তবে সেই যোগ্যতা বিকাশের সুযোগ যেন ভৌগোলিক অবস্থান, আর্থিক সামর্থ্য কিংবা সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কারণে কারও কাছ থেকে কেড়ে না নেওয়া হয়।
বাংলার ফুটবলকে বাঁচাতে হলে প্রতিভাকে বাঁচাতে হবে
আমরা যদি সত্যিই চাই যে আগামী দিনে বাংলার ফুটবল আবার তার ঐতিহ্য ও গৌরব ফিরে পাক, তাহলে শুধু অতীতের স্মৃতিচারণ করে লাভ হবে না। বর্তমান পরিস্থিতি বুঝতে হবে, দুর্বলতা চিহ্নিত করতে হবে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য কার্যকর ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
একটি প্রতিভাবান ছেলে বা মেয়ে যেন অর্থের অভাবে প্রশিক্ষণ ছেড়ে না দেয়। একটি গ্রামের প্রতিভা যেন সুযোগের অভাবে হারিয়ে না যায়। একজন যোগ্য খেলোয়াড় যেন যথাযথ মূল্যায়ন থেকে বঞ্চিত না হন। এই নিশ্চয়তা দেওয়া সরকার, ক্রীড়া প্রশাসন, প্রশিক্ষক এবং ফুটবল ক্লাবগুলির সম্মিলিত দায়িত্ব।
পশ্চিমবঙ্গ সরকারের কাছে আমার দৃঢ় আবেদন—এই বিষয়টিকে গুরুত্ব দিয়ে দেখুন, একটি অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করুন, তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধান চালান এবং প্রতিভাবান তরুণ ফুটবলারদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সরকারি বৃত্তির সুসংহত ব্যবস্থা গড়ে তুলুন।
এটি শুধু ফুটবল নিয়ে আবেগের বিষয় নয়। এটি বাংলার ক্রীড়া-ঐতিহ্য রক্ষা, যুবসমাজকে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া এবং আগামী প্রজন্মের সামনে নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলে দেওয়ার বিষয়।
বাংলার ফুটবলকে নতুন করে জাগিয়ে তুলতে হলে গ্রামের মাঠ থেকে বড় স্টেডিয়াম পর্যন্ত প্রতিভার পথ তৈরি করতে হবে। অতীত আমাদের গর্ব, বর্তমান আমাদের দায়িত্ব, আর ভবিষ্যৎ আমাদের হাতে।
জয় হিন্দ! বন্দে মাতরম!
— অশোক কুমার সিং
অ্যাডভোকেট, হাইকোর্ট, কলকাতা
No comments:
Post a Comment