প্রথমে আগুন জ্বালাও, তারপর সেই আগুন নেভানোর ভান করো
জাতীয় নিরাপত্তা, দায়িত্বশীল স্বাধীনতা এবং ভারতবর্ষের ঐক্য সম্পর্কে একটি বার্তা
“First burn and then douse down the fire” — অর্থাৎ, “প্রথমে আগুন জ্বালাও, তারপর সেই আগুন নেভানোর ভান করো” — বর্তমান বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে এই কৌশল অনুসরণ করা হচ্ছে বলে মনে হয়। প্রথমে অশান্তি সৃষ্টি করা, মানুষের মধ্যে বিভেদ বাড়ানো, সংঘাতকে উসকে দেওয়া, জনসাধারণের মধ্যে অবিশ্বাস ছড়ানো এবং রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতাকে দুর্বল করার চেষ্টা করা হয়। তারপর পরিস্থিতি যখন সংকটজনক হয়ে ওঠে, তখন সেই অশান্তি প্রশমনের কৃতিত্ব নেওয়ার জন্য কেউ কেউ শান্তির দূত হিসেবে নিজেদের উপস্থাপন করে।
এই কৌশলের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এর প্রতারণামূলক চরিত্র। যারা অস্থিরতা সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখে, তারাই পরবর্তীকালে শান্তি প্রতিষ্ঠার দাবিদার হয়ে উঠতে পারে। কিন্তু ততক্ষণে সমাজের ঐক্য, পারস্পরিক বিশ্বাস, নিরাপত্তা এবং স্বাভাবিক জীবনযাত্রার যথেষ্ট ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
ভারতবর্ষ আজ এক গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও কৌশলগত বাস্তবতার কেন্দ্রে অবস্থান করছে। আমাদের সুপ্রাচীন সভ্যতা, সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য, গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান এবং জাতীয় অগ্রগতির আকাঙ্ক্ষা ভারতকে বিশ্বমঞ্চে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাই আমাদের দেশের অভ্যন্তরীণ শান্তি, জাতীয় ঐক্য এবং সাংবিধানিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
ভারতবর্ষের শক্তি কেবল তার সামরিক ক্ষমতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন কিংবা প্রযুক্তিগত অগ্রগতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের প্রকৃত শক্তি নিহিত রয়েছে জনগণের দৃঢ় মানসিকতা, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, গণতান্ত্রিক চেতনা এবং প্রতিকূলতার মধ্যেও ঐক্যবদ্ধ থাকার ক্ষমতার মধ্যে।
তবে সতর্কতার সঙ্গে প্রজ্ঞার সমন্বয় থাকা আবশ্যক। প্রত্যেক মতবিরোধ রাষ্ট্রবিরোধিতা নয়, প্রত্যেক প্রতিবাদ নৈরাজ্য নয়, আর সরকারের প্রতিটি সমালোচনাই দেশবিরোধী কার্যকলাপ নয়। একটি পরিণত গণতন্ত্রের দায়িত্ব হলো বৈধ ও শান্তিপূর্ণ মতপ্রকাশ এবং পরিকল্পিত হিংসা, উসকানি ও বেআইনি কার্যকলাপের মধ্যে সুস্পষ্ট পার্থক্য নির্ধারণ করা।
যে ব্যক্তি বা সংগঠন ইচ্ছাকৃতভাবে হিংসা ছড়ায়, বেআইনি কার্যকলাপে যুক্ত হয়, সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ উসকে দেয় কিংবা সমাজের শান্তি ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে, তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা অবশ্যই প্রয়োজন। কোনও ব্যক্তি বা সংগঠন তার রাজনৈতিক প্রভাব, মতাদর্শ কিংবা সামাজিক পরিচয়ের কারণে আইনের ঊর্ধ্বে থাকতে পারে না।
কিন্তু একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে যে, কেবল ভিন্নমত পোষণ করার কারণে কাউকে দেশদ্রোহী বা রাষ্ট্রের শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। ন্যায়বিচার হতে হবে নিরপেক্ষ, শাস্তি হতে হবে অপরাধের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং প্রতিটি পদক্ষেপ হতে হবে সংবিধান ও আইনের সীমার মধ্যে।
ব্যক্তিগত প্রতিশোধ, রাজনৈতিক বিদ্বেষ কিংবা প্রশাসনিক স্বেচ্ছাচারের পরিবর্তে আইনের শাসনই হতে হবে আমাদের পথপ্রদর্শক।
বাক্স্বাধীনতা: অধিকার, কিন্তু দায়িত্বহীনতার লাইসেন্স নয়
বাক্স্বাধীনতা গণতন্ত্রের অন্যতম প্রধান স্তম্ভ। ভারতের সংবিধানের ১৯(১)(ক) অনুচ্ছেদ নাগরিকদের বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা প্রদান করেছে। একই সঙ্গে ১৯(২) অনুচ্ছেদে সংবিধাননির্ধারিত নির্দিষ্ট কারণে এই স্বাধীনতার উপর যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ আরোপের সুযোগ রাখা হয়েছে।
অতএব, স্বাধীনতার অধিকার যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনই গুরুত্বপূর্ণ সেই অধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতা।
মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে কখনও হিংসা ছড়ানো, অপরাধে প্ররোচনা দেওয়া কিংবা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করা উচিত নয়। আবার জাতীয় নিরাপত্তার অজুহাতে বৈধ সমালোচনা ও শান্তিপূর্ণ মতবিরোধকে দমন করাও গণতান্ত্রিক আদর্শের পরিপন্থী।
মনে রাখতে হবে—মতবিরোধ এবং নৈরাজ্য এক বিষয় নয়; সমালোচনা এবং ষড়যন্ত্র এক বিষয় নয়; স্বাধীনতা এবং স্বেচ্ছাচারও এক বিষয় নয়।
এই পার্থক্য নির্ধারিত হওয়া উচিত নির্ভরযোগ্য প্রমাণ, ন্যায়সংগত আইনি প্রক্রিয়া, সাংবিধানিক মূল্যবোধ এবং স্বাধীন বিচারব্যবস্থার মাধ্যমে।
আগুন লাগানোর রাজনীতি নয়, আগুন লাগার আগেই সতর্কতা
ভারতবর্ষের জনগণকে এমন কোনও কৌশলের শিকার হতে দেওয়া উচিত নয়, যেখানে প্রথমে বিভেদ সৃষ্টি করা হয় এবং পরে সেই বিভেদ দূর করার নামে কৃতিত্ব অর্জনের চেষ্টা চলে।
আমাদের প্রয়োজন দূরদর্শিতা, সচেতনতা, দায়িত্বশীল নাগরিকত্ব এবং জাতীয় স্বার্থ সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা। আমাদের এমন একটি সমাজ গড়ে তুলতে হবে, যেখানে কোনও ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ধর্ম, ভাষা, জাতি, অঞ্চল কিংবা রাজনৈতিক মতাদর্শের ভিত্তিতে মানুষকে পরস্পরের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়ে দেওয়ার সুযোগ না পায়।
ভারতবর্ষকে রক্ষা করার অর্থ কেবল তার সীমান্ত রক্ষা করা নয়; দেশের অভ্যন্তরে শান্তি, সম্প্রীতি, সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান এবং মানুষের পারস্পরিক বিশ্বাসকেও রক্ষা করা।
আমাদের দৃঢ় অবস্থান হওয়া উচিত—
দুর্বলতা নয়, শান্তির সঙ্গে শক্তি।
অন্ধ সন্দেহ নয়, সতর্কতার সঙ্গে প্রজ্ঞা।
দায়িত্বহীনতা নয়, স্বাধীনতার সঙ্গে কর্তব্যবোধ।
বৈষম্য নয়, ন্যায়বিচারের সঙ্গে সমতা।
আসুন, আমরা এমন এক ভারত গড়ে তুলি, যে ভারত তার জাতীয় স্বার্থ রক্ষায় দৃঢ়, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে অবিচল, আইনের শাসনে বিশ্বাসী এবং বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের আদর্শে অনুপ্রাণিত।
ভারতবর্ষের ঐক্য ও অগ্রগতির পথে কোনও বিভেদসৃষ্টিকারী শক্তিকে আমাদের অন্ধভাবে অনুসরণ করা চলবে না। আমাদের বিচারবুদ্ধি, বিবেক এবং সাংবিধানিক মূল্যবোধকে সর্বদা জাগ্রত রাখতে হবে।
ভারত বাঁচুক ঐক্যে, শক্তিশালী হোক ন্যায়ে, এগিয়ে চলুক উন্নয়নের পথে।
জয় হিন্দ!
বন্দে মাতরম্!
অশোক কুমার সিংহ
অ্যাডভোকেট, হাইকোর্ট, কলকাতা
No comments:
Post a Comment