যিনি নিতে জানেন, কিন্তু দিতে শেখেননি
আমার কলেজজীবনের এক বন্ধু আজও আমার সঙ্গে একই পেশায় যুক্ত। সমাজে তাঁর একটি পরিচিতি ও ভাবমূর্তি রয়েছে; তাই তাঁর নাম প্রকাশ করা সমীচীন হবে না। তবে ব্যক্তিগত ও পেশাগত সম্পর্ক বজায় রাখার ক্ষেত্রে তাঁর একটি অদ্ভুত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য বহুদিন ধরেই আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে।
কয়েক দিন আগে তাঁর জন্মদিন ছিল। যথারীতি তিনি ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নিজের জন্মদিনের কথা প্রচার করেছেন। ভারতে ফেসবুক ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম জনপ্রিয় হওয়ার পর থেকে তিনি প্রতিবছর অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে এই কাজটি করে আসছেন। আপনি হয়তো তাঁর জন্মদিন ভুলে যেতে পারেন, কিন্তু তিনি আপনাকে ভুলতে দেবেন না। জন্মদিন আসার আগেই কিংবা সেদিন সকাল থেকে তাঁর পোস্টগুলি যেন একটি নির্ভুল অ্যালার্মের মতো সবাইকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আজ তাঁর জন্মদিন!
তিনি বন্ধু, সহকর্মী ও পরিচিত ব্যক্তিদের জন্মদিনের অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছেন; অন্যের আয়োজনে উপস্থিত থেকে সৌজন্য গ্রহণও করেছেন। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, নিজের জন্মদিনে কাউকে আমন্ত্রণ জানিয়ে কোনো অনুষ্ঠান করার কথা তিনি জীবনে কখনও ভাবেননি। কলকাতা তো দূরের কথা, পৃথিবীর কোথাও নিজের জন্মদিনে কাউকে আপ্যায়ন করার জন্য তিনি আহ্বান জানিয়েছেন বলে আমার জানা নেই।
প্রতিবছর জন্মদিনে তিনি স্ত্রী ও সন্তানদের নিয়ে যাদবপুরের ৮বি বাসস্ট্যান্ডের নিকট, একটি পেট্রোল পাম্পের পিছনে অবস্থিত পরিচিত রেস্তোরাঁয় যান। এটি তাঁর বহু বছরের পারিবারিক রুটিন। পরিবার নিয়ে জন্মদিন উদ্যাপন করা অবশ্যই প্রশংসনীয়; প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত পরিসর ও নিজস্ব পছন্দের অধিকার রয়েছে। কিন্তু যিনি সারাবছর বন্ধু ও সহকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার দাবি করেন এবং সামাজিক সম্পর্কের সুবিধা গ্রহণ করেন, তিনি যদি কখনও তাঁদের সঙ্গে নিজের আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার ন্যূনতম আগ্রহও প্রকাশ না করেন, তখন সেই সম্পর্কের প্রকৃতি নিয়ে প্রশ্ন জাগা স্বাভাবিক।
গত কয়েক বছর ধরে আদালত-চত্বরে তিনি কয়েকজন সহকর্মীকে নিয়ে একটি ঘনিষ্ঠ গোষ্ঠীও গড়ে তুলেছেন। বাইরে থেকে সেটি বন্ধুত্বপূর্ণ বা সামাজিক সম্পর্ক বলে মনে হলেও, আমার পর্যবেক্ষণে তার প্রধান উদ্দেশ্য যেন পেশাগত যোগাযোগ বজায় রাখা, মামলার কাজ ও নিয়োগ পাওয়া এবং আর্থিক সুবিধা অর্জন করা। সামাজিক কল্যাণ, সহকর্মীদের বিপদে পাশে দাঁড়ানো কিংবা নিঃস্বার্থ সৌহার্দ্য—এসবের বিশেষ কোনো প্রকাশ সেখানে চোখে পড়ে না।
তবুও সেই সহকর্মীরা প্রতিবছর তাঁর জন্মদিনে আদালত-চত্বরে ছোট একটি কেক নিয়ে আসেন এবং সামান্য মূল্যের কোনো উপহার দিয়ে তাঁকে শুভেচ্ছা জানান। উপহারের মূল্য অর্থে সামান্য হতে পারে, কিন্তু তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে আন্তরিকতা, সময়, স্মরণ এবং ভালোবাসা। তিনি আনন্দের সঙ্গে কেক কাটেন, শুভেচ্ছা ও উপহার গ্রহণ করেন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই মুহূর্তের ছবিও প্রকাশ করেন। কিন্তু সম্পর্কের অপর প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষগুলির প্রতি একই আন্তরিকতা ফিরিয়ে দেওয়ার প্রবণতা তাঁর মধ্যে খুব কমই দেখা যায়।
তিনি যেন সম্পর্ককে পারস্পরিক আদান-প্রদানের বিষয় হিসেবে নয়, বরং নিজের প্রয়োজন পূরণের একটি মাধ্যম হিসেবে দেখেন। তিনি নিতে অভ্যস্ত—শুভেচ্ছা, উপহার, পেশাগত সহযোগিতা, সামাজিক স্বীকৃতি ও মামলার কাজ; কিন্তু দেওয়ার সময় তাঁর হাত যেন সংকুচিত হয়ে যায়। অথচ দেওয়া মানেই মূল্যবান উপহার কিংবা ব্যয়বহুল ভোজ নয়। একটি আন্তরিক আমন্ত্রণ, এক কাপ চা, একটি ফোনকল, বিপদের সময় পাশে দাঁড়ানো অথবা অন্যের আনন্দকে নিজের আনন্দ বলে গ্রহণ করাও সম্পর্কের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের সুন্দর উপায়।
মানুষের প্রকৃত চরিত্র সে কত বড় কেক কাটল, কত উপহার পেল কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কতজন তাকে শুভেচ্ছা জানাল—তার দ্বারা নির্ধারিত হয় না। চরিত্রের পরিচয় পাওয়া যায়, সে অন্যের আনন্দে কতটা আন্তরিকভাবে অংশ নেয়, সম্পর্কের প্রতি কতটা দায়িত্বশীল থাকে এবং প্রাপ্ত সৌজন্যের কতটুকু ফিরিয়ে দিতে জানে, তার মাধ্যমে।
গল্পের নৈতিক শিক্ষা
সম্পর্ক কোনো একমুখী রাস্তা নয়। কেবল গ্রহণ করে যাওয়া এবং প্রয়োজনের সময় মানুষকে ব্যবহার করা সম্পর্ক রক্ষা নয়; সেটি সুবিধাবাদিতা। বন্ধুত্ব ও সহকর্মিতার আসল সৌন্দর্য পারস্পরিকতা, আন্তরিকতা এবং দেওয়া-নেওয়ার ভারসাম্যের মধ্যে নিহিত।
জন্মদিনের সবচেয়ে বড় শিক্ষা বয়স বৃদ্ধি নয়—হৃদয়ের পরিধি বৃদ্ধি। যে ব্যক্তি প্রতিবছর নিজের জন্মদিন সবাইকে মনে করিয়ে দেন, তাঁরও উচিত অন্যদের কথা মনে রাখা এবং নিজের আনন্দের সামান্য অংশ তাঁদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া। কারণ কেকের আকার বা উপহারের মূল্য নয়, মানুষের উদারতা ও পারস্পরিক আচরণই শেষ পর্যন্ত তার প্রকৃত পরিচয় হয়ে থাকে।
যিনি শুধু নিতে জানেন, তিনি সাময়িকভাবে অনেক কিছু সংগ্রহ করতে পারেন; কিন্তু যিনি দিতে জানেন, তিনিই মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন লাভ করেন।
No comments:
Post a Comment