Monday, September 7, 2026

ভারতের লক্ষ্য শান্তি—নোবেল পুরস্কার নয়

 

ভারতের লক্ষ্য শান্তি—নোবেল পুরস্কার নয়

ভারতের উচিত বিশ্বের সামনে সুস্পষ্ট ও দৃপ্তকণ্ঠে ঘোষণা করা যে, ভারত নোবেল শান্তি পুরস্কারের কোনো দাবিদার নয়। ভারত কোনো পদক, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি অথবা ব্যক্তিগত সম্মানের আশায় শান্তি প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ গ্রহণ করে না। শান্তি, সংলাপ, সহাবস্থান এবং সমগ্র মানবজাতির কল্যাণের প্রতি ভারতের যে সুপ্রাচীন সভ্যতাগত অঙ্গীকার রয়েছে, সেই আদর্শ থেকেই তার সমস্ত কূটনৈতিক প্রচেষ্টার জন্ম।

ভারতীয় সভ্যতা চিরকাল ঘোষণা করেছে—

“বসুধৈব কুটুম্বকম্”—সমগ্র পৃথিবী একটি পরিবার।

এই মহান আদর্শে বিশ্বাসী ভারত রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধকে কেবল দুটি দেশের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে দেখে না। এটি এক গভীর মানবিক বিপর্যয়। এই যুদ্ধ অসংখ্য মানুষের প্রাণ কেড়ে নিয়েছে, লক্ষ লক্ষ পরিবারকে বাস্তুচ্যুত করেছে এবং সমগ্র বিশ্বের খাদ্য, জ্বালানি ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তাকে বিপন্ন করেছে। যুদ্ধক্ষেত্র ইউরোপে হলেও তার দুর্ভোগ বহন করতে হচ্ছে পৃথিবীর বহু দূরবর্তী দেশের সাধারণ মানুষকেও।

আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে ভারতের অবস্থান অত্যন্ত স্বতন্ত্র। রাশিয়ার সঙ্গে ভারতের দীর্ঘদিনের ঐতিহাসিক ও বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে। একই সঙ্গে ইউক্রেন, ইউরোপ, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং বিশ্বের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশের সঙ্গেও ভারত সুসম্পর্ক বজায় রেখেছে। ভারত বারবার মনে করিয়ে দিয়েছে—যুদ্ধ কখনো কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে না; শেষ পর্যন্ত আলোচনা, কূটনীতি এবং পারস্পরিক সমঝোতার মাধ্যমেই শান্তির পথ খুঁজে নিতে হয়।

রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধ বন্ধ করার লক্ষ্যে ভারতের উদ্যোগ ফলপ্রসূ হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। কারণ ভারতের অবস্থান কোনো সামরিক জোট, আধিপত্য বিস্তার অথবা ভূরাজনৈতিক প্রতিহিংসার দ্বারা পরিচালিত নয়। ভারত কোনো পক্ষকে অপমানিত বা পরাজিত করতে চায় না। ভারত এমন একটি সম্মানজনক ও বাস্তবসম্মত সমাধান চায়, যার মাধ্যমে উভয় পক্ষের ন্যায্য উদ্বেগ বিবেচিত হবে, সার্বভৌমত্বের মর্যাদা রক্ষিত হবে এবং নিরপরাধ মানুষের রক্তপাত বন্ধ হবে।

শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, সংযম, সাহস এবং পারস্পরিক সমন্বয়। কোনো একটি পক্ষের সমস্ত দাবি অস্বীকার করে কিংবা তাকে সম্পূর্ণভাবে পরাজিত করে স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠা করা যায় না। প্রকৃত শান্তির জন্য আলোচনার টেবিলে উভয় পক্ষকেই কিছুটা নমনীয়তা ও পারস্পরিক গ্রহণযোগ্যতার পরিচয় দিতে হয়।

ভারতের প্রচেষ্টায় যদি এই যুদ্ধের অবসান ঘটে এবং তার জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির প্রশ্ন ওঠে, তবে ভারত উদারতার সঙ্গে অন্য কোনো যোগ্য ব্যক্তি—বিশেষত যুদ্ধের দুর্ভোগ সহ্য করা কিংবা মানবিক সেবায় প্রত্যক্ষ অবদান রাখা কোনো ব্যক্তিকে—সেই সম্মানের জন্য এগিয়ে দিতে পারে। ভারতের প্রকৃত পুরস্কার হবে অস্ত্রের গর্জন থেমে যাওয়া, বাস্তুচ্যুত মানুষের ঘরে ফিরে আসা, বিচ্ছিন্ন পরিবারের পুনর্মিলন এবং নিরপরাধ প্রাণের রক্ষা।

ভারতের মতো এক মহান সভ্যতার শান্তির প্রতি অঙ্গীকার প্রমাণ করার জন্য কোনো পুরস্কারের প্রয়োজন নেই। ভারতের ইতিহাস, দর্শন এবং কর্মধারাই তার প্রমাণ। উপনিষদের বিশ্বকল্যাণের বাণী, ভগবান বুদ্ধের করুণা ও অহিংসার শিক্ষা এবং মহাত্মা গান্ধীর সত্য ও অহিংসার আদর্শ যুগে যুগে মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছে—প্রকৃত শক্তি প্রতিপক্ষকে ধ্বংস করার মধ্যে নয়; শত্রুতাকে বোঝাপড়া ও সহযোগিতায় রূপান্তরিত করার মধ্যেই নিহিত।

অন্যরা পুরস্কার ও ব্যক্তিগত স্বীকৃতির জন্য প্রতিযোগিতা করতে পারে। কিন্তু ভারতের প্রতিযোগিতা হওয়া উচিত যুদ্ধ, রক্তপাত, ক্ষুধা, বাস্তুচ্যুতি এবং বিদ্বেষের বিরুদ্ধে। ভারতের মধ্যস্থতা ও কূটনৈতিক প্রচেষ্টায় যদি রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধের অবসান ঘটে, তবে শিশুদের মুখে ফিরে আসা হাসি, পরিবারের পুনর্মিলন এবং অসংখ্য নিরপরাধ মানুষের জীবনরক্ষাই হবে যেকোনো পদকের চেয়ে বহুগুণ বড় সম্মান।

অতএব, ভারতের উচিত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বিশ্বকে বলা—

আমরা নোবেল শান্তি পুরস্কার চাই না; আমরা প্রকৃত শান্তি চাই। আমরা ব্যক্তিগত গৌরব চাই না; আমরা রক্তপাতের অবসান চাই। আমরা পুরস্কার গ্রহণের জন্য কোনো মঞ্চে উঠতে চাই না; আমরা যুদ্ধরত পক্ষগুলিকে আলোচনার টেবিলে আনতে চাই।

এটাই হবে ভারতের প্রকৃত পরিচয়—যে ভারত করতালির জন্য নয়, মানবতার জন্য কাজ করে; ব্যক্তিগত স্বীকৃতির জন্য নয়, জাতিগুলির মধ্যে পুনর্মিলনের জন্য উদ্যোগী হয়; এবং কোনো পুরস্কারের জন্য নয়, স্থায়ী বিশ্বশান্তির জন্য নিরলসভাবে এগিয়ে চলে।

জয় হিন্দ।

অশোক কুমার সিংহ
অ্যাডভোকেট, কলকাতা হাইকোর্ট

No comments:

Post a Comment