“একজন রিকশাচালক বলছিল—ভগবান আমাদের জন্য নন”
একজন রিকশাচালক অত্যন্ত আক্ষেপের সঙ্গে বলছিলেন—“ভগবান আমাদের জন্য নন।” কথাটি খুবই সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে দীর্ঘদিনের দারিদ্র্য, বঞ্চনা, পরিশ্রম, অপমান এবং অসহায়তার এক গভীর ইতিহাস। যিনি প্রতিদিন নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি দিয়ে অন্য মানুষকে তাদের গন্তব্যে পৌঁছে দেন, তিনি নিজেই যেন জীবনের কাঙ্ক্ষিত গন্তব্য থেকে ক্রমশ দূরে সরে যান। প্রখর রোদ, প্রবল বর্ষা কিংবা শীতের কনকনে হাওয়া—কোনো কিছুই তাঁর শ্রমকে থামাতে পারে না। তবুও সারাদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের শেষে তাঁর হাতে এতটুকু অর্থ থাকে না, যা দিয়ে নিশ্চিন্তে পরিবারের মুখে দু’বেলা অন্ন তুলে দিতে পারেন।
সকালবেলা যখন শহরের অধিকাংশ মানুষ ঘুম থেকে ওঠেনি, তখনই তিনি জীবিকার সন্ধানে রিকশা নিয়ে রাস্তায় বেরিয়ে পড়েন। সারাদিন যাত্রী বহন করে তাঁদের অফিস, বিদ্যালয়, বাজার কিংবা হাসপাতালে পৌঁছে দেন। কোনো কোনো যাত্রী সামান্য ভাড়া নিয়ে দর-কষাকষি করেন, কেউ তাঁর সঙ্গে কঠোর ভাষায় কথা বলেন, আবার কেউ তাঁকে একজন পূর্ণ মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবেও বিবেচনা করেন না। অথচ তাঁরও একটি পরিবার আছে, সন্তানদের শিক্ষিত করার স্বপ্ন আছে, অসুস্থ হলে চিকিৎসা পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা আছে এবং সম্মানের সঙ্গে বেঁচে থাকার অধিকার আছে।
সম্ভবত তিনি প্রতিদিন কোনো মন্দিরের সামনে দিয়ে যাতায়াত করেন। সেখানে দেখেন—ভক্তদের ভিড়, মূল্যবান ফুলের মালা, দামি প্রসাদ, জাঁকজমকপূর্ণ পূজা এবং বিপুল অর্থের আয়োজন। কিন্তু মন্দিরের সিঁড়ির বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর মনে প্রশ্ন জাগে—যে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে এত আয়োজন, সেই ঈশ্বর কি তাঁর ক্ষুধার্ত সন্তানের কান্না শুনতে পান না? তাঁর স্ত্রীর চিকিৎসার জন্য অর্থের অভাব কি ঈশ্বর দেখতে পান না? তাঁর বৃদ্ধ বাবা-মায়ের ওষুধ কেনার অসহায়তা কি ঈশ্বরের নজরে পড়ে না? এই অব্যক্ত প্রশ্নগুলো একসময় জমে গিয়ে তাঁর মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে—“ভগবান আমাদের জন্য নন।”
কিন্তু বাস্তবে ভগবান কোনো ধনী কিংবা দরিদ্র মানুষের একক সম্পত্তি নন। ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মূল্যবান উপহার কিংবা বাহ্যিক জাঁকজমক দিয়ে ঈশ্বরকে নিজের করে নেওয়া যায় না। ঈশ্বর যদি কোথাও থাকেন, তবে তিনি হয়তো সেই রিকশাচালকের ঘামে, তাঁর সততায়, তাঁর আত্মত্যাগে এবং সন্তানদের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার সংগ্রামের মধ্যেই বিরাজমান। সারাদিন অমানুষিক পরিশ্রম করেও যিনি অন্যের সম্পদের প্রতি লোভ করেন না, অন্যায় পথে উপার্জন করেন না এবং সমস্ত কষ্ট সহ্য করে পরিবারকে রক্ষা করেন—তাঁর চেয়ে বড় সাধক আর কে হতে পারেন?
প্রকৃতপক্ষে রিকশাচালকের এই অভিযোগ ঈশ্বরের বিরুদ্ধে যতটা, তার চেয়ে অনেক বেশি আমাদের সমাজের বিরুদ্ধে। আমরা মন্দিরে গিয়ে ঈশ্বরের কাছে দয়া ও করুণা প্রার্থনা করি, অথচ মন্দিরের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা দরিদ্র মানুষটির প্রতি সামান্য সহানুভূতিও দেখাই না। ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বিপুল অর্থ ব্যয় করি, কিন্তু একজন শ্রমজীবী মানুষ তাঁর ন্যায্য পারিশ্রমিক চাইলে দর-কষাকষি করি। আমরা দেবতার মূর্তিতে ফুল অর্পণ করি, অথচ জীবন্ত মানুষের ঘাম, ক্ষুধা এবং কষ্টকে উপেক্ষা করি। এই বৈপরীত্যই তাঁকে বিশ্বাস করতে বাধ্য করে যে ভগবান বুঝি কেবল ধনী ও সৌভাগ্যবান মানুষের জন্য।
যেদিন কোনো যাত্রী তাঁর প্রাপ্য ভাড়ার চেয়ে সামান্য বেশি দিয়ে বলবেন, “এই রোদে আপনি অনেক কষ্ট করেছেন”; যেদিন কেউ তাঁকে অবজ্ঞা না করে সম্মানের সঙ্গে “দাদা” বলে সম্বোধন করবেন; যেদিন তাঁর সন্তান অর্থের অভাবে বিদ্যালয় থেকে ফিরে আসবে না; যেদিন অসুস্থ হলে তিনি বিনা বাধায় চিকিৎসা পাবেন—সেদিন হয়তো তাঁর ধারণা বদলে যাবে। তিনি বুঝতে পারবেন, ভগবান দূরের কোনো মন্দিরে নন; মানুষের সহানুভূতি, ন্যায়বোধ এবং ভালোবাসার মধ্যেই তাঁর প্রকাশ।
একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে অন্নই প্রসাদ, অসুস্থ মানুষের কাছে চিকিৎসাই আশীর্বাদ এবং পরিশ্রমী মানুষের কাছে ন্যায্য পারিশ্রমিকই ঈশ্বরের কৃপা। তাই রিকশাচালকের কথাটিকে অবিশ্বাস কিংবা অধার্মিকতা বলে প্রত্যাখ্যান করা উচিত নয়। বরং আমাদের নিজেদের জিজ্ঞাসা করা উচিত—আমাদের আচরণই কি তাঁকে এমন কথা বলতে বাধ্য করেছে? সমাজ যদি একজন পরিশ্রমী মানুষকে মর্যাদা, নিরাপত্তা এবং ন্যায্য অধিকার দিতে ব্যর্থ হয়, তবে তাঁর মনে ঈশ্বর সম্পর্কে হতাশা জন্ম নেওয়া অস্বাভাবিক নয়।
ভগবান যদি সত্যিই সকলের হন, তবে তাঁর ভক্তদেরও সকল মানুষের পাশে দাঁড়াতে হবে। পূজা তখনই পূর্ণতা পায়, যখন তার সঙ্গে মানবসেবা যুক্ত হয়। প্রার্থনা তখনই অর্থবহ হয়, যখন তা আমাদের অন্যের কষ্ট অনুভব করতে শেখায়। ধর্ম তখনই জীবন্ত হয়ে ওঠে, যখন একজন অসহায় মানুষ আমাদের আচরণের মধ্যে ঈশ্বরের করুণা অনুভব করেন।
রিকশাচালকের সেই করুণ উচ্চারণ তাই আমাদের বিবেকের সামনে এক কঠিন প্রশ্ন রেখে যায়—ভগবান কি সত্যিই তাঁর জন্য নন, নাকি আমরা ভগবানের নামে এমন এক সমাজ তৈরি করেছি, যেখানে দরিদ্র মানুষ নিজের জন্য ঈশ্বরের সামান্য স্থানটুকুও খুঁজে পান না? মনে রাখতে হবে, ঈশ্বর কখনো দরিদ্র মানুষকে পরিত্যাগ করেন না; মানুষই অনেক সময় নিজের স্বার্থপরতা, বৈষম্য এবং নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে তাঁর কাছে পৌঁছানোর পথটি আড়াল করে দেয়।
No comments:
Post a Comment