Wednesday, August 26, 2026

মানবসেবার উজ্জ্বল নক্ষত্র ডাঃ পি. কে. গাঙ্গুলী—আমাদের প্রিয় কানুদার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

 




মানবসেবার উজ্জ্বল নক্ষত্র ডাঃ পি. কে. গাঙ্গুলী—আমাদের প্রিয় কানুদার প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধাঞ্জলি

আমাদের সকলের পরম শ্রদ্ধেয়, চিকিৎসাবিজ্ঞানের জগতে এক উজ্জ্বল নক্ষত্র, সঙ্ঘ পরিবারের আদর্শে আদর্শিত, অসহায় ও সাধারণ মানুষের পরম আপনজন, বিশিষ্ট চিকিৎসক ডাঃ পি. কে. গাঙ্গুলী—আমাদের অত্যন্ত প্রিয় ‘কানুদা’—আজ আর আমাদের মধ্যে নেই। তাঁর প্রয়াণে নেতাজীনগরসহ সমগ্র সমাজ হারাল একজন অসাধারণ চিকিৎসককে, আর আমরা হারালাম একজন স্নেহশীল অভিভাবক, নিঃস্বার্থ সমাজসেবক এবং প্রকৃত মানবদরদী মানুষকে।

তাঁর মৃত্যু কেবল একজন চিকিৎসকের জীবনাবসান নয়; এটি মানবিকতা, সহমর্মিতা ও নিঃস্বার্থ সেবার এক জীবন্ত অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি। তিনি চিকিৎসাকে কখনো নিছক পেশা বা অর্থ উপার্জনের মাধ্যম হিসেবে দেখেননি। চিকিৎসা তাঁর কাছে ছিল মানুষের পাশে দাঁড়ানোর পবিত্র ব্রত—দুঃস্থের যন্ত্রণা লাঘব করা, অসহায় মানুষকে সাহস দেওয়া এবং রোগীর মুখে সুস্থতার হাসি ফিরিয়ে আনার এক মহৎ সাধনা।

আজীবন মানবসেবায় নিজেকে উৎসর্গ করেছিলেন আমাদের প্রিয় কানুদা। সরকারি হাসপাতালে দীর্ঘকাল সাধারণ মানুষের চিকিৎসায় নিয়োজিত থেকে তিনি অগণিত মানুষের জীবন রক্ষা করেছেন। সমাজের দরিদ্র ও পিছিয়ে পড়া মানুষ তাঁর কাছে কখনো অবহেলিত হননি। তাঁদের আর্থিক সামর্থ্য কতটুকু, তাঁরা চিকিৎসার খরচ বহন করতে পারবেন কি না—এসব বিষয় তাঁর সেবার পথে কোনোদিন বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি। রোগীর অসুস্থতা এবং তাঁর চিকিৎসার প্রয়োজনই ছিল কানুদার কাছে সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ।

তাঁর সেই স্নেহময় কণ্ঠস্বর আজও কানে বাজে—
“আমাকে ভিজিট দিতে হবে না; ওই পয়সায় ছানা খেয়ে নিস, শরীর ভালো থাকবে।”

এই কয়েকটি সাধারণ কথার মধ্যেই লুকিয়ে ছিল তাঁর অসাধারণ হৃদয়ের পরিচয়। একজন চিকিৎসক রোগীকে বিনা পারিশ্রমিকে চিকিৎসা করছেন—এটাই যেখানে বিরল, সেখানে তিনি আবার রোগীকে নিজের ভিজিটের টাকা দিয়ে পুষ্টিকর খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিতেন। কারণ তিনি জানতেন, শুধু ওষুধ নয়—সঠিক খাদ্য, যত্ন এবং ভালোবাসাও একজন অসুস্থ মানুষকে সুস্থ করে তোলে।

কতবার দেখা গেছে, বাড়ির গ্রিলের ফাঁক দিয়ে সাদা কাগজে ছোট করে প্রয়োজনীয় ওষুধের নাম লিখে দিয়েছেন। আবার কখনো নিজেই গ্রিলের ফাঁক দিয়ে ওষুধ এগিয়ে দিয়ে স্নেহের সঙ্গে বলেছেন—
“এটা খেয়ে নিস, কিনতে হবে না।”

এই দৃশ্য আজ শুধুই স্মৃতি। কিন্তু সেই ছোট্ট সাদা কাগজে লেখা ওষুধের নাম কিংবা বিনামূল্যে এগিয়ে দেওয়া কয়েকটি ট্যাবলেটের মধ্যে যে অপরিসীম মমতা, মানবিকতা ও আশীর্বাদ মিশে থাকত, তা কোনো অর্থের মাপকাঠিতে পরিমাপ করা সম্ভব নয়। তাঁর চিকিৎসায় ছিল বিজ্ঞানের জ্ঞান; আর তাঁর আচরণে ছিল পিতা, অভিভাবক ও পরম আত্মীয়ের ভালোবাসা।

সাধারণ মানুষের কাছে তিনি শুধু একজন চিকিৎসক ছিলেন না; তিনি ছিলেন তাঁদের নির্ভরতার আশ্রয়, দুর্দিনের ভরসা এবং বিপদের সময়ে সাহসের উৎস। দরিদ্র মানুষের অসহায় মুখে তিনি ঈশ্বরকে দেখতে পেতেন। সেই কারণেই নেতাজীনগরের বহু মানুষের কাছে তিনি ছিলেন একজন “জীবন্ত ভগবান”। কারণ মানুষের জীবন রক্ষা করা, অসহায়কে সাহায্য করা এবং কোনো প্রতিদানের প্রত্যাশা না রেখে মানুষের সেবা করার মধ্যেই তিনি নিজের জীবনের প্রকৃত সার্থকতা খুঁজে পেয়েছিলেন।

তাঁর মধ্যে চিকিৎসকের কঠোর নিয়মানুবর্তিতা যেমন ছিল, তেমনই ছিল কোমল হৃদয়ের অপরিসীম স্নেহ। তাঁর কাছে গিয়ে কোনো মানুষ শুধু ওষুধ নিয়ে ফিরে আসতেন না; সঙ্গে নিয়ে আসতেন মানসিক সাহস, আশ্বাস এবং বেঁচে থাকার নতুন শক্তি। তাঁর একটি স্নেহের কথা, একটি আশ্বাস কিংবা মাথায় রাখা আশীর্বাদের হাত অসুস্থ ও বিপন্ন মানুষকে অনেকখানি সুস্থ করে তুলত।

ব্যক্তিগতভাবে বহুবার তাঁর সান্নিধ্য লাভ করার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা ও আশীর্বাদ আমার জীবনের অমূল্য সম্পদ হয়ে থাকবে। তাঁর সঙ্গে কাটানো প্রতিটি মুহূর্ত, তাঁর মানবিক আচরণ এবং সাধারণ মানুষের প্রতি তাঁর অকৃত্রিম ভালোবাসা আজীবন আমার স্মৃতিতে অম্লান থাকবে। তাঁর আশীর্বাদ মাথায় নিয়ে আমিও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত সমাজ ও মানুষের সেবায় নিজেকে নিয়োজিত রাখার সংকল্প করছি।

একজন মহৎ মানুষ দেহত্যাগ করলেও তাঁর আদর্শের মৃত্যু হয় না। মানুষের কল্যাণে নিবেদিত তাঁর কর্ম, তাঁর ত্যাগ, তাঁর সহমর্মিতা এবং তাঁর নিঃস্বার্থ সেবার ইতিহাস আমাদের মধ্যে চিরকাল বেঁচে থাকবে। তিনি আমাদের শিখিয়ে গিয়েছেন—মানুষের প্রকৃত পরিচয় তার পদ, অর্থ বা সামাজিক প্রতিষ্ঠায় নয়; মানুষের প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় অন্য মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানোর মধ্যে।

আসুন, আমরা তাঁর স্মৃতির প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা জানিয়ে মানবসেবার সেই মহান আদর্শকে নিজেদের জীবনে ধারণ করি। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াই, বিপন্ন মানুষকে সাহায্য করি এবং মানুষের কল্যাণে আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যাই। মানবকল্যাণে ডাঃ পি. কে. গাঙ্গুলীর দেখানো পথই হোক আমাদের চলার পথ। তাঁর জীবন ও কর্ম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের চিকিৎসক, সমাজসেবী এবং সাধারণ মানুষের কাছে মানবিকতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকুক।

প্রিয় কানুদা, আপনার শূন্যস্থান কোনোদিন পূরণ হওয়ার নয়। আপনার স্নেহভরা কণ্ঠস্বর, আপনার আশ্বাস, আপনার চিকিৎসা এবং আপনার মমতাময় উপস্থিতি আমরা প্রতিটি মুহূর্তে অনুভব করব। আপনি শারীরিকভাবে আমাদের মধ্যে না থাকলেও আপনার আদর্শ, স্মৃতি ও আশীর্বাদ আমাদের হৃদয়ে চিরদিন জীবন্ত থাকবে।

যেখানেই থাকুন, ভালো থাকবেন ডাক্তারবাবু।
পরম করুণাময়ের কাছে আপনার বিদেহী আত্মার চিরশান্তি কামনা করি। শোকসন্তপ্ত পরিবার, আত্মীয়স্বজন, সহকর্মী, গুণমুগ্ধ ও অগণিত রোগীর প্রতি জানাই আমার গভীর সমবেদনা।

ওঁ শান্তিঃ শান্তিঃ শান্তিঃ।

বিনম্র শ্রদ্ধায়
অশোক কুমার সিংহ
অ্যাডভোকেট
হাইকোর্ট, কলকাতা

No comments:

Post a Comment